আমাদের মায়ের ভাষা
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
আতাউর রহমান
ভাষা একটি দেশের সভ্যতার পরিচায়ক- এহেন উক্তি সম্পর্কে আজকের বিশ্বে
কোনো সন্দেহ নেই। মুখের ভাষা এবং লিখিত ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্ত হয় আমাদের সব
অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ; আমাদের রাগ-দুঃখ, সুখ-ভালোবাসা, এমনকি দ্রোহ চেতনাও।
ভাষা যে কোনো দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রধান মাধ্যম। আমরা
বাংলাদেশের বাঙালিরা জানি 'ভাষা' আমাদের হৃদয়ের কতখানি জুড়ে অবস্থান করছে।
ভালোবাসা মানুষের একটি বিমূর্ত অনুভূতি; অন্তরের এক অনিঃশেষ বহিঃপ্রকাশ।
ভালোবাসার কোনো নিরেট বস্তুর মতো রূপ-গন্ধ বা চেহারা নেই; অবয়বহীন ভালোবাসা
মানুষের সবচেয়ে সুন্দর-সুস্মিত হৃদয়াবেগের পরিবাহন। আমরা যখন উচ্চারণ করি-
আমি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারি, আমি আমার বন্ধুর জন্য প্রাণ দিতে পারি;
কেবল তখনই আমরা মনুষ্য পদবাচ্যে উন্নীত হই। প্রাণিজগতের মানুষের নিত্যকার
জৈবিক আচরণ খুব একটা ভিন্ন নয়; কিন্তু মানুষ সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে ওঠে
প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা এবং অন্তরের-বাইরের শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে। বাঙালির ললাটে দুটি বিজয়ের গৌরবতিলক অঙ্কিত হয়ে আছে। প্রথম বিজয়তিলক অঙ্কিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যখন আমাদের মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্তের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ব্যাঘ্র-থাবার বজ্র আঁটুনি থেকে। উর্দু ভাষাকে সে সময় আমাদেরও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড প্রয়াস গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। সেদিন বীর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল শাসকচক্রের বিরুদ্ধে এবং রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার গৌরব দান করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা আজ পৃথিবীর চতুর্থ প্রধান ভাষা এবং সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের অধিবাস, যারা কথা বলে ও স্বপ্ন দেখে বাংলা ভাষাতেই। আমাদের ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনই বীজ বপন করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের; নয় মাসের যে রক্তক্ষয়ী জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হলো একটি নতুন দেশ, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
আমি মনে করি, বাংলা ভাষায় লিখে যদি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া যেত, তাহলে বাঙালি লেখকদের দাপটে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লেখকরা ম্রিয়মাণ হয়ে যেতেন।
ভাষা নদীর স্রোতের মতো সতত বহমান, যা সমসাময়িক সময়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতায় মিলেমিশে একীভূত হয়। সেই কারণে, সংস্কৃৃত ভাষানির্ভর মাইকেলীয় ও বিদ্যাসাগরীয় বাংলা আধুনিক যুগে অপ্রয়োজনীয়- এই ধ্বনি না তুললেও আমরা আধুনিক কালের মুখের ও লেখার ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তবে সেই ভাষাকেও ব্যাকরণসিদ্ধ হতে হয়। বাংলা কথ্য ও লিখিত ভাষার রূপ পেল এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন রচনায়। তবে বাংলা ভাষার সৌন্দর্যমণ্ডিত রূপ অলঙ্কার, অনুপ্রাস, অনুষঙ্গ, উপমা, গীতলতা সব বাঙালি সব সময় অনুধাবন করতে পারে না। বাংলা ভাষায় একটি বস্তু অথবা প্রাণীর কত প্রতিশব্দ আছে! যেমন 'হাতি'র প্রতিশব্দ একাধিক- হস্তী, ঐরাবত, গজ, করী ইত্যাদি। রাত্রির প্রতিশব্দ যেমন রজনী, বিভাবরী ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ তার গানে বিভাবরী ও রজনী একাধিক বার ব্যবহার করেছেন। বাংলায় যেমন দুটি শব্দ আছে, যার প্রতিশব্দ অন্য ভাষায় নেই। যেমন 'অভিমান' ও 'অভিসার'। কারণ বাঙালিই কেবল অভিমান করে, অভিসারে যায়। ধারণা করি, পৃথিবীর সব ভাষাতেই দেশ ও জাতিগতভাবে নিজস্ব অনুভব ও প্রীতিভিত্তিক শব্দ আছে, যা অন্য ভাষীদের কাছে অনেক সময় বোধগম্য হয়ে ওঠে না। এও দেখার বিষয় আছে, ষোড়শ শতকের উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ইংরেজি আজকের ইংরেজি পাঠকের কাছেও সার্বিকভাবে বোধগম্য হয় না। এলিজাবেথিয়ান শতাব্দীর ইংরেজি ও আজকের ইংল্যান্ডের অনেক ইংরেজি পাঠকের কাছে সর্বতোভাবে বোধগম্য হয় না। আমি আধুনিক কালের একাধিক ইংরেজ অভিনেতাকে বলতে শুনেছি, তারা শেকসপিয়রের নাটকে অভিনয় করেন ঠিকই, কিন্তু সব সংলাপের মর্মার্থ বোঝেন না। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের অধিবিদ্যক ইংরেজ কবি জন ডানের অতিবিখ্যাত কবিতাগুলোর বেশ কয়েকটি আধুনিক ইংরেজি শব্দ সংযোজনে সহজীকরণ করা হয়েছে আজকের পাঠকের কথা ভেবে। যেমন, তার বিখ্যাত কবিতা 'নো ম্যান জি এন আয়ল্যান্ড'। পুরনো ইংরেজি পাঠ হলো “No man Iland, intire of itselfe; every man is a peece of the continent, a part of the maine. বর্তমানে আমরা পড়ি'“No man is an island, entire of itself, every man is a piece of the continent, a part of the main. পুরনো এবং আধুনিক বানানের পার্থক্য লক্ষণীয়। অবশ্য বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে হুবহু এমনটি হয়নি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা আমরা আজও অপরিবর্তিতভাবে পড়ি। বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি, কিন্তু প্রমিত বাংলায় কথা বলার সময় আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ অথবা যে ভাষার প্রভাব থেকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনেকেই মুক্ত নন। আঞ্চলিক ভাষা যে কোনো দেশের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ সমর্থনযোগ্য নয়। যে কোনো দেশের আঞ্চলিক ভাষা সে দেশের সার্বিক ভাষাসম্ভারকে সমৃদ্ধ করে। যে কারণে পৃথিবীর সব দেশেই একাধিক আঞ্চলিক ভাষা আছে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জার্মানিসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশের আঞ্চলিক ভাষা সে দেশের প্রমিত ভাষা থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে অবস্থান করে। ইংল্যান্ডের 'কক্নি' এবং আমেরিকার ট্যাক্সান ইংরেজিকে 'ইংরেজি' হিসেবে চেনা যায় না।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষা সমৃদ্ধ এবং বর্ণিল। কারণ আমাদের দেশের মাটিতে অতীতে শক, হূণ, মোগল, পাঠান, আরব, ইংরেজ, আর্মেনিয়ান, ডাচ্, ফরাসি, পর্তুগিজ, আরাকানিসহ অনেক দেশের মানুষ এসেছে এবং রেখে গেছে বাংলা ভাষার অঙ্গে তাদের আগমনী চিহ্ন। সে জন্য আমাদের দেশের জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ১৯৬৫ সালে দুটো বৃহৎ অবয়বের অভিধান, যা বাংলা একাডেমি বর্তমানে একখণ্ড প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই দুখণ্ডে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের আঞ্চলিক তথা উপভাষাগুলোর অর্থ প্রদান করা হয়েছে। এই অভিধান দু'খণ্ড হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে দেখা যাবে উপ-ভাষার মোহনীয় বৈচিত্র্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষা অর্থাৎ শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসের অনেক হেরফের হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ জেলা, উপজেলা, থানা এমনকি একই জেলার গ্রাম থেকে গ্রামে উপ-ভাষার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ম্যাকস্মুলার বলেছেন, ুঞযব ৎবধষ ধহফ হধঃঁৎধষ ষরভব ড়ভ ষধহমঁধমব রং রহ ফরধষবপঃং.চ্ অর্থাৎ ভাষার প্রকৃত ও স্বাভাবিক সৃজন উপ-ভাষাগুলোতে নিহিত। এই উপ-ভাষাগুলোর ওপর ভর করেই প্রমিত ভাষার সৃষ্টি হয়। উপ-ভাষা অথবা আঞ্চলিক ভাষাগুলোই হচ্ছে প্রমিত ভাষার অন্তরাত্মা। কারণ একজন শিশুর যখন মুখে কথা ফোটে তখন সে তার অঞ্চলের উপ-ভাষাতেই আধো আধো বুলি উচ্চারণে নিজেকে প্রকাশ করে। সেই উপ-ভাষাগুলোর ওপর নির্ভর করেই একটি দেশের শব্দভাণ্ডার ও ভাষা প্রস্তুত হয়। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, যার ভিত রচিত দেশের অসংখ্য উপ-ভাষাকে কেন্দ্র করে। আমাদের কোনোটিকে অবজ্ঞা করা চলে না। যখন কথা বলব আনুষ্ঠানিক ভাষায় তখন তা প্রমিত হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং নিজ-গৃহে স্বজন-বন্ধুদের সঙ্গে নিত্যদিন যে কথা বলব, তা আঞ্চলিক বা উপ-ভাষায় অবশ্যই সিদ্ধ। কারণ সেই ভাষা যে অন্তরের ভাষা। সবশেষে বলব, ভাষা নিয়ে খেলতে পারেন সেসব মেধাবী ও ক্ষণজন্মা কবি-সাহিত্যিকরা যারা বিশ্বের বিশ্ব-মননের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। সেই কারণে উইলিয়াম শেক্সপিয়র ও রবীন্দ্রনাথের ব্যাকরণগত ভুল শব্দও গৃহীত হয়েছে। একইভাবে আমাদের বরিশালের অনন্য কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ব্যবহৃত অদ্ভুতভাবে চম্কে দেওয়ার মতো উপমা ও রূপকের ব্যবহারগুলো আমাদের ভাবায় ও অসীম আকাশের মেঘের ভেলায় ভাসায়। এদের ভুল ধরবে কে? বিশ্বজুড়ে এদের মতো সাহিত্যস্রষ্টাদের আপাত ভুলগুলো পুষ্পিত হয়ে আমাদের ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ।
আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণ সমগ্র জাতিকে উদ্বেলিত-আলোড়িত করেছিল, তেমন তুলনাহীন ভাষা কেবল স্বর্গ থেকেই প্রাপ্ত হয় বলে আমার বিশ্বাস। এই রকম অনন্য ভাষণের ভাষার তুলনা-প্রতিতুলনা হয় না। সবশেষে, আমার বাংলা ভাষা সংগ্রামের এই ফেব্রুয়ারি মাসে তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার এই মাসে সব ভাষা-যোদ্ধার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রণতি জানাই এবং আমার মাতৃভূমির মাটিতে মাথা স্পর্শ করে ধন্য হই।
(মঞ্চসারথি আতাউর রহমান)
অভিনেতা-নাট্যনির্দেশক-লেখক
একুশে পদকপ্রাপ্ত
Comments
Post a Comment